বাংলাদেশি কর্মীদের ভিসা বন্ধ করল লাওস, কারণ খুঁজছে বাংলাদেশ
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
০৬-১০-২০২৬ ১১:২২:৫৪ পূর্বাহ্ন
আপডেট সময় :
০৬-১০-২০২৬ ১১:২২:৫৪ পূর্বাহ্ন
ফাইল ছবি
লাওসে বাংলাদেশি কর্মীদের নিয়োগ, ওয়ার্ক পারমিট ও শ্রমিক শ্রেণির ভিসা ইস্যু চার মাসের জন্য স্থগিত করেছে দেশটির সরকার। অবৈধ প্রবেশ, মানব পাচার ও অননুমোদিতভাবে শ্রমিক সরবরাহ ঠেকানোর পাশাপাশি বাংলাদেশি কর্মীদের প্রতারণার শিকার হওয়ার বিষয়টিও সামনে এসেছে। এ অবস্থায় লাওসে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে কাগজপত্র যাচাই আরও কঠোর করেছে বাংলাদেশ।বিবিসি বাংলা
এদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ লাওসে বাংলাদেশি কর্মীদের শ্রমবাজার সাময়িকভাবে স্থগিত হওয়ার কারণ খুঁজছে বাংলাদেশ। গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত চার মাসের জন্য বাংলাদেশি নাগরিকদের নতুন করে শ্রমিক নিয়োগ, ওয়ার্ক পারমিট এবং শ্রমিক শ্রেণির ভিসা ইস্যু স্থগিত রেখেছে লাওস।
লাওসের শ্রম ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ৯ সেপ্টেম্বরের নির্দেশনার বরাত দিয়ে বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় গত ২৮ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। সেখানে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য শ্রমিক শ্রেণির এলএ-বি২ ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার কথাও জানানো হয়।
তবে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য এই স্থগিতাদেশের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো জানায়নি লাওস সরকার। প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক জানিয়েছেন, বিষয়টি জানতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, স্থগিতাদেশের সুনির্দিষ্ট কারণ লাওস বাংলাদেশকে জানায়নি। লাওসে বাংলাদেশের দূতাবাস না থাকায় পাশের দেশের দূতাবাসের মাধ্যমে বিষয়টি জানার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে দেশটির শ্রমবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি এবং সেখানে বাংলাদেশি কর্মীদের সম্ভাবনা সম্পর্কে প্রতিবেদন দিতে সংশ্লিষ্টদের বলা হয়েছে।
তবে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, লাওসে বিভিন্ন নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশি শ্রমিকরা কাজ করেন। দেশটির অনেক প্রতিষ্ঠানে কাজের পরিমাণ কমে যাওয়ায় শ্রমিকের চাহিদা কমে থাকতে পারে। সেই কারণেও আপাতত শ্রমবাজার স্থগিত করা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন তিনি।
অবৈধ প্রবেশ ও মানব পাচার ঠেকাতে পদক্ষেপ
লাওসের শ্রম ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার বরাত দিয়ে ১৪ সেপ্টেম্বর ‘দ্য লাওসিয়ান টাইমসে’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়, অবৈধ প্রবেশ, মানব পাচার, অননুমোদিত শ্রমিক সরবরাহকারী এবং বিদেশ থেকে শ্রমিক আনার পর দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া নিয়োগদাতাদের নিয়ন্ত্রণে এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
তবে কেন সুনির্দিষ্টভাবে বাংলাদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, সে বিষয়ে লাওসের শ্রম মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় সুস্পষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি বলে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি, কোম্পানি, নিয়োগদাতা বা লেবার অপারেটর স্বাধীনভাবে বাংলাদেশি নাগরিকদের লাওসে প্রবেশ বা কর্মসংস্থানের অনুমতি দিতে পারবেন না।
লাওস সরকারের এই সিদ্ধান্তের আওতায় নতুন করে বাংলাদেশি কর্মীদের ওয়ার্ক পারমিট দেয়া, শ্রমিক আমদানির পরিকল্পনা এবং শ্রম প্রকল্পের অনুমোদনও স্থগিত থাকবে। তবে লাওস সরকারের অনুমোদিত বড় অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্প, যেগুলোর কাজের সময়সূচি চুক্তির মাধ্যমে নির্ধারিত রয়েছে, সেগুলো এই স্থগিতাদেশের আওতামুক্ত থাকবে বলে ‘দ্য লাওসিয়ান টাইমসে’র প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতারণা থেকে সতর্ক বাংলাদেশ
লাওসের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকারও দেশটিতে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সতর্কতা বাড়িয়েছে। বিশেষ করে ভুয়া ভিসা ও অননুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে প্রতারণার শিকার না হতে কর্মীদের সতর্ক করেছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লাওসে যাওয়ার জন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে পাসপোর্ট জমা না দিতে এবং কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন না করতে বাংলাদেশি কর্মীদের অনুরোধ করা হয়েছে।
প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক জানিয়েছেন, লাওস ও কম্বোডিয়ার মতো দেশে বাংলাদেশি কর্মীরা প্রতারণার শিকার হওয়ায় এসব দেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে কাগজপত্র আরও কঠোরভাবে যাচাই করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, একজন কর্মী কী কাজের জন্য যাচ্ছেন, কোথায় যাচ্ছেন এবং কতদিনের জন্য যাচ্ছেন এসব বিষয় যাচাই করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট নথিপত্রও আগের তুলনায় আরও সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা হচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রীর আরও বলেন, কিছু রিক্রুটিং এজেন্সি ভুয়া কোম্পানির সঙ্গে যোগসাজশ করে লাওসের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে চাহিদাপত্র এনে কর্মী পাঠিয়েছে। কিন্তু সেখানে প্রকৃতপক্ষে ওই ধরনের কাজ না থাকায় কর্মীরা সমস্যায় পড়েছেন।
আইন ভাঙলে জরিমানা ও ফেরত পাঠানোর বিধান
লাওসের নির্দেশনায় অনুমোদন ছাড়া বাংলাদেশি শ্রমিক আনা বা নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়োগদাতাদের জন্য আর্থিক জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
অনুমোদন ছাড়া শ্রমিক আনা বা নিয়োগ করলে প্রতিটি ঘটনায় শ্রমিকপ্রতি ২৫ লাখ লাও কিপ বা ১১০ মার্কিন ডলার জরিমানা দিতে হবে। অন্য শ্রমিক ইউনিটে নিয়োগের জন্য শ্রমিক আনা হলেও একই জরিমানার বিধান রয়েছে।
অন্য শ্রমিক ইউনিটের জন্য নির্ধারিত কোনো শ্রমিককে কাজে ব্যবহার বা গ্রহণ করলে নিয়োগদাতাকে প্রতিটি ঘটনায় শ্রমিকপ্রতি ২০ লাখ লাও কিপ বা ৮৯ মার্কিন ডলার জরিমানা দিতে হবে।
এ ছাড়া অনুমোদন ছাড়া অননুমোদিত কর্মস্থলে কাজ করলে সংশ্লিষ্ট শ্রমিককে প্রতিটি ঘটনায় ১০ লাখ লাও কিপ বা ৪৪ মার্কিন ডলার জরিমানা দিতে হবে। একই সঙ্গে তাকে ৩০ দিনের মধ্যে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে।
কোনো কর্মীকে দেশে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে যাতায়াতসহ সব খরচ নিয়োগদাতা অথবা আইন ভঙ্গকারী পক্ষকে বহন করতে হবে। একই ধরনের অপরাধ পুনরায় করলে জরিমানার পরিমাণ তিন গুণ করার পাশাপাশি অন্যান্য আইনগত ব্যবস্থাও নেয়া হতে পারে বলে লাওস সরকারের সিদ্ধান্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
নির্মাণ ও উৎপাদন খাতে বাংলাদেশি কর্মী
বাংলাদেশ থেকে লাওসে যাওয়া কর্মীদের বড় অংশ নির্মাণ ও উৎপাদন খাতে কাজ করেন বলে জানিয়েছে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তবে বর্তমানে লাওসে ঠিক কতজন বাংলাদেশি কর্মী রয়েছেন, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী।
একটি বাংলাদেশি সংবাদপত্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে প্রায় তিন হাজার বাংলাদেশি কর্মী লাওসে যাওয়ার জন্য ছাড়পত্র নিয়েছেন। বাংলাদেশি কর্মী অভিবাসনের তালিকায় লাওসের অবস্থান ১৩তম।
এর আগে গত বছর তিন হাজার ৮৩৫ জন বাংলাদেশি কর্মী লাওসে যাওয়ার জন্য ছাড়পত্র নিয়েছিলেন।
প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক বলেন, বাংলাদেশের কর্মীদের জন্য লাওস বড় কোনো শ্রমবাজার নয়। দেশটির অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও খুব ভালো নয়। সেখানে মূলত কিছু চীনা প্রকল্পে বাংলাদেশি কর্মীরা কাজ করতে যান।
স্থগিতাদেশের পর কী হবে, তা এখনো অনিশ্চিত
লাওসে বাংলাদেশি কর্মীদের নিয়োগ, ওয়ার্ক পারমিট ও শ্রমিক শ্রেণির ভিসা ইস্যুর ওপর আরোপিত স্থগিতাদেশ আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। তবে এরপর দেশটির শ্রমবাজার বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য আবার উন্মুক্ত হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে লাওসের শ্রমবাজারের পরিস্থিতি, স্থগিতাদেশের কারণ এবং ভবিষ্যতে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য সেখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ কী থাকবে এসব বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে লাওস, কম্বোডিয়া এবং অন্যান্য দেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে বৈধ অভিবাসন নিশ্চিত করতে কাগজপত্র যাচাই এবং সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার।
অবৈধ পথে ইউরোপে যাওয়া ঠেকাতেও সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী। বিশেষ করে অবৈধ পথে ইতালি যাওয়া, সার্বিয়া হয়ে ইউরোপে প্রবেশ এবং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেয়ার মতো প্রবণতা বন্ধে সচেতনতামূলক কার্যক্রমের পাশাপাশি দেশের ভেতরেও বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।
লাওসের ক্ষেত্রে বর্তমান স্থগিতাদেশের মধ্য দিয়ে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়ায় যেমন সাময়িক বিরতি এসেছে, তেমনি ভুয়া চাহিদাপত্র, অননুমোদিত রিক্রুটিং এবং প্রতারণার ঝুঁকি ঠেকাতে বাংলাদেশি কর্মীদের আরও সতর্ক থাকার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে।
বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স